দেশ বিক্রি করেও তিস্তার পানি আনতে পারেনি হাসিনা” — মির্জা ফখরুল

জাকারিয়া শেখ, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধঃ  বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ তিস্তা নদী আজ মরতে বসেছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে, নদী নির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা সংকটে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে তিস্তা নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারাচ্ছে, যার ফলে লাখো মানুষ চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে এবং ন্যায্য পানির হিস্যার দাবিতে শুরু হয়েছে তিস্তা বাঁচানোর আন্দোলন।

সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) কুড়িগ্রামের রাজারহাটের তিস্তা নদীর তীরে শুরু হয় দুই দিনের এই প্রতিবাদ কর্মসূচি। হাজারো মানুষ এতে অংশ নিয়ে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। উত্তরের ১১টি স্থানে একযোগে চলা এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে মানুষ জড়ো হয়েছেন। লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারিসহ তিস্তা অববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পদযাত্রা, লোকজ গান, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং গ্রামীণ খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। তিস্তা বাঁচানোর দাবিতে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। নদীর মাঝখানে বসানো হয়েছে রঙ-বেরঙের তাঁবু, যা এ প্রতিবাদ কর্মসূচিকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা।


বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আয়োজিত বিশেষ কর্মসূচিতে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেবেন। তার বক্তব্যের মাধ্যমে কর্মসূচির গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।

তিস্তা নদীরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবীব দুলু বলেছেন, তিস্তা চুক্তি ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়, বরং এটি রংপুরবাসীর সার্বিক আন্দোলন। তিনি আরও বলেন, এই আন্দোলন জনদাবিতে পরিণত হয়েছে এবং এতে তিস্তা পাড়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন রয়েছে।

এ কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যগণ ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম।এছাড়াও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, শামসুজ্জামান দুদু, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন।

সোমবার বিকেল সাড়ে কুড়িগ্রাম রাজারহাটের তিস্তা নদীর পাড়ে  তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে আয়োজিত জনতার সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিস্তা পাড়ের মানুষের বিপুল অভ্যর্থনার মধ্যে তিনি মঞ্চে আসেন এবং তার বক্তব্যে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, “পতিত হাসিনা দেশকে বিক্রি করে দিয়ে একফোঁটা পানিও আনতে পারেনি। ভারত তাকে আশ্রয় দিলেও দেশের মানুষকে ন্যায্য পানির হিস্যা থেকে বরাবর বঞ্চিত করেছে। আমরা এই অন্যায় মানি না। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আমাদের লড়াই চলবে, যতদিন না এই সমস্যার সমাধান হয়।”

তিনি আরও বলেন, “ভারত ন্যায্য পানি আটকে আমাদের বিপদে ফেলছে, আর শেখ হাসিনা দিল্লির আশ্রয়ে থেকে তাদের স্বার্থ রক্ষা করছে। যতদিন ভারতের দাদাগিরি বন্ধ না হবে, ততদিন বাংলাদেশ-ভারতের জনগণের মধ্যে প্রকৃত বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে না।”

মির্জা ফখরুল আরো বলেন, “দেশকে স্থিতিশীল রাখতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করলেই আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারব।”

উত্তরবঙ্গের কৃষক ও নদী-নির্ভর জনগোষ্ঠীর দাবি, ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে তিস্তার উজানে একতরফাভাবে বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করছে, ফলে বাংলাদেশের অংশে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। চাষাবাদ, মৎস্য খাত, নৌপরিবহন—সবই বিপর্যস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় তিস্তা পাড়ের মানুষ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি তুলেছেন। তারা মনে করেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে নদী রক্ষা পাবে, কৃষকরা সেচের পানি পাবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।

প্রতিবাদে অংশ নেওয়া এক কৃষক বলেন, “আমাদের ধানের জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, মাছ ধরার পুকুর শুকিয়ে গেছে। আমরা বাঁচতে চাই, আমাদের ন্যায্য পানির অধিকার চাই।

একজন তরুণ সমাজকর্মী বলেন, “এই প্রতিবাদ শুধু তিস্তা পাড়ের মানুষের নয়, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলন। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার চাই, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।”

তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের আয়োজকরা জানিয়েছেন, এই প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের পানি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরতে চান। তাদের দাবি, বাংলাদেশকে ন্যায্য পানি দিতে ভারতের প্রতি আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা হোক।

তিস্তা নদীর প্রাণ ফেরাতে এবং পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে উত্তরবঙ্গের মানুষের এই প্রতিবাদ কর্মসূচি কেবল শুরু। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তিস্তা বাঁচানোর লড়াই শেষ হবে না, যতদিন পর্যন্ত না পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হয়।


Categories: কুড়িগ্রাম,রংপুর বিভাগ,সর্বশেষ

Comments are closed

ব্রেকিং নিউজ