
জাকারিয়া শেখ,কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় একটি অনন্য সাহিত্য-সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন স্কুল শিক্ষক তৌহিদ-উল ইসলাম। স্থানীয় বড়ভিটা ইউনিয়নের উত্তর বড়ভিটা গ্রামে গড়ে তুলেছেন দেশের দ্বিতীয় ‘লেখক জাদুঘর’, যার নাম ‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর’। তার হাতে গড়া এই জাদুঘর বাংলা সাহিত্য ও ভাষার ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করছে, যা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এক বিরল ধনভাণ্ডার।
তৌহিদ-উল ইসলাম, পেশায় লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক, দীর্ঘদিন ধরে বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণে আগ্রহী ছিলেন। নিজ উদ্যোগে ১৪ শতাংশ জমির ওপর এই জাদুঘরটি গড়ে তুলেছেন তিনি। তার সংগ্রহে রয়েছে দুই শতাধিক প্রয়াত কবি ও লেখকের জীবনী, দুর্লভ চিঠি, পুরোনো পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও সাহিত্য বিষয়ক পাণ্ডুলিপি।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই জাদুঘর দেশের দ্বিতীয় লেখক জাদুঘর। এর আগে ২০১১ সালে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে দেশের প্রথম লেখক জাদুঘরটি চালু হয়েছিল।
‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর’ পাঁচটি গ্যালারিতে বিভক্ত। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে ১৯৩৬ সালের মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সম্পাদিত মাসিক ‘মোহাম্মদী’, ১৯৪৫ সালের কালীশ মুখোপাধ্যায়ের ‘রূপ-মঞ্চ’, ১৯৫৫ সালের শ্রী দিলীপ সেন গুপ্ত সম্পাদিত ‘সচিত্র ভারতী’ এবং ১৯৬০ সালের মাসিক ‘মৃদঙ্গ’। আরও রয়েছে ১৯৬১ সালের ‘জলসা’, ১৯৬৩ সালের ‘সন্দেশ’, ১৯৬৮ সালের ‘সচিত্র সন্ধানী’ ও ১৯৫৯ সালের ‘পাকিস্তানী খবর’।
এছাড়া, ১৫০ বছর আগের ‘বঙ্গদর্শন’, ১১০ বছরের পুরোনো ‘সবুজপত্র’, ১৯৫১ সালে প্রকাশিত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ব্যাকরণ বই এবং শতবর্ষী ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’ এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। রেডিও পাকিস্তানের পাক্ষিক পত্রিকা ‘এলান’ থেকে শুরু করে, ১৯৬৫-১৯৭২ সালের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকাও রয়েছে।
শুধু জাদুঘর নয়, তৌহিদ-উল ইসলাম ২০১১ সালে নিজ খরচে প্রতিষ্ঠা করেন ‘তৌহিদ-উল ইসলাম পাঠাগার’, যেখানে ৬,০০০-এর বেশি বই রয়েছে। ২০২১ সালে তিনি গড়ে তুলেন “সৈয়দ শামসুল হক কালচারাল ক্লাব”, যেখানে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চা হয়। এছাড়া, ২০২১ সাল থেকে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘সৈয়দ শামসুল হক শিশুসাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান শুরু করেন, যার অর্থমূল্য ২০,০০০ টাকা।
জাদুঘর, পাঠাগার ও সৈয়দ শামসুল হক কালচারাল ক্লাব প্রতিষ্ঠায় তৌহিদ-উল ইসলাম তার ব্যক্তিগত জমি বিক্রি করেছেন। ২০২২ সালে তিনি ‘আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা’ পান। সেই সম্মাননার দুই লাখ টাকা দিয়েই শুরু হয় জাদুঘর নির্মাণের কাজ। পরবর্তীতে নিজের জমানো টাকা থেকে আরও কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করেন তিনি।
তৌহিদ-উল ইসলাম শুধু সাহিত্যচর্চার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি পরিবেশ রক্ষার জন্য ব্যক্তি উদ্যোগে চালু করেছেন ‘বৃক্ষভাতা কর্মসূচি’। ফুলবাড়ী এবং রাজারহাট উপজেলায় এই কার্যক্রম ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছে।
তৌহিদ-উল ইসলামের স্ত্রী আমিনা সুলতানা বলেন, “শুরুর দিকে স্বামীর এই উদ্যোগকে পাগলামি মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন বুঝি, তিনি সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করছেন। তার এই উদ্যোগ আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।”
বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর ইতোমধ্যেই স্থানীয় শিক্ষার্থী ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।বড়ভিটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী একাদশী রানী বলেন, “পাঠাগারে বই পড়তে আসলে আমরা চকলেট পাই। গ্রামের শিক্ষার্থীরা বই পড়ে অনেক জ্ঞান অর্জন করছে।”
তৌহিদ-উল ইসলাম বলেন, “আমার উপার্জনের অর্ধেকই এই জাদুঘর, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক ক্লাবের পেছনে ব্যয় হয়েছে। দুর্লভ পত্র-পত্রিকা সংগ্রহে অনেক টাকা খরচ করতে হয়েছে। আমি চাই, এই প্রতিষ্ঠানগুলো জাতিগঠনে ভূমিকা রাখুক।”
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখক, গবেষক ও শিক্ষক ড. আব্দুল হালিম প্রামানিক সম্রাট জাদুঘর’টি পরিদর্শন করে বলেন,
“একজন শিক্ষক, গীতিকার, সাহিত্যিক ও সংগঠক হিসেবে তৌহিদ-উল ইসলাম যে অবদান রেখেছেন, তা কুড়িগ্রাম ও দেশের জন্য এক অনন্য অর্জন। তার একক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা ‘বঙ্গভাষা লেখক জাদুঘর’ কালের সাক্ষী হয়ে থাকবে।”
তৌহিদ-উল ইসলামের উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যক্তি উদ্যোগেই সমাজের পরিবর্তন আনা সম্ভব। তার এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে। সমাজ ও দেশের জন্য তৌহিদ-উল ইসলামের এই আত্মত্যাগ ও সাধনা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।



